ত্রিপুরা বার অ্যাসোসিয়েশন নির্বাচনে বিরোধী সমর্থিত ‘সংবিধান বাঁচাও মঞ্চ’-এর জয়ের পর উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছেন বিজয়ী প্রার্থীরা ও সমর্থকরা।
আগরতলা, ১৪ জুন: শনিবার ১৩ জুন রাজ্যে টানা আট বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা বিজেপির জন্য ত্রিপুরা বার অ্যাসোসিয়েশন নির্বাচনের ফলাফল নিঃসন্দেহে একটি বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। ২০২৬-২৭ বর্ষের কার্যনির্বাহী কমিটির নির্বাচনে শাসকদল সমর্থিত আইনজীবী প্যানেল অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ পদে পরাজিত হওয়ায় রাজনৈতিক এবং আইনজীবী মহলে শুরু হয়েছে জোর আলোচনা। ফলাফল সামনে আসতেই প্রশ্ন উঠেছে—এটি কি বিরোধী শিবিরের সাংগঠনিক সাফল্য, নাকি বিজেপির অন্দরের গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব ও অন্তর্ঘাতের প্রতিফলন?
নির্বাচনের ফল অনুযায়ী, বিরোধী সমর্থিত ‘সংবিধান বাঁচাও মঞ্চ’ সভাপতি, সম্পাদক, সহ-সম্পাদকসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদে জয়লাভ করেছে। সভাপতি পদে পৃথা দেব পাল, সম্পাদক পদে ভাস্কর দেববর্মা এবং সহ-সম্পাদক পদে মল্লিকা সাহা ও ভবানী রঞ্জন ভট্টাচার্য নির্বাচিত হন। পাশাপাশি সাধারণ সদস্য পদেও বিরোধী শিবিরের প্রার্থীরা উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেন। ফলে দীর্ঘদিন ধরে বার অ্যাসোসিয়েশনে নিজেদের প্রভাব বজায় রাখার চেষ্টা করা বিজেপি সমর্থিত আইনজীবী গোষ্ঠী বড় ধাক্কার মুখে পড়েছে।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই ফলাফলের পিছনে একাধিক কারণ কাজ করেছে। প্রথমত, প্রার্থী নির্বাচন নিয়ে বিজেপির আইনজীবী সংগঠনের ভেতরে অসন্তোষ ছিল বলে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা চলছিল। একাধিক প্রবীণ ও পরিচিত মুখকে প্রার্থী না করা এবং বিভিন্ন পদে মনোনয়ন নিয়ে অসন্তুষ্টির জেরে দলের ভেতরে বিভাজন তৈরি হয়েছিল বলে অভিযোগ। অনেকের মতে, এই অসন্তোষ ভোটের দিন পর্যন্ত বজায় ছিল এবং তার সরাসরি প্রভাব পড়েছে ফলাফলে।
দ্বিতীয়ত, দলের অভ্যন্তরীণ গোষ্ঠীকোন্দলও পরাজয়ের অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে আসছে। রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, বিজেপির বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে সমন্বয়ের অভাব এবং নেতৃত্বের সঙ্গে তৃণমূল স্তরের আইনজীবীদের দূরত্ব নির্বাচনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। ফলে দলের একটি অংশ নিষ্ক্রিয় থেকেছে অথবা প্রত্যাশিতভাবে কাজ করেনি, যার সুযোগ নিয়েছে বিরোধীরা।

অন্যদিকে, বিজয়ী ‘সংবিধান বাঁচাও মঞ্চ’-এর নেতাদের দাবি, তারা কোনও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে লক্ষ্য করে নয়, বরং আইনজীবীদের পেশাগত অধিকার, বার-এর গণতান্ত্রিক পরিবেশ এবং সাংবিধানিক মূল্যবোধের প্রশ্নকে সামনে রেখে প্রচার চালিয়েছেন। সেই বার্তাই আইনজীবীদের মধ্যে ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে এবং ভোটবাক্সে তার প্রতিফলন দেখা গেছে।
উল্লেখ্য, ত্রিপুরা বার অ্যাসোসিয়েশন রাজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আইনজীবী সংগঠন। এই সংগঠনের নির্বাচন শুধু আইনজীবী মহলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং রাজ্যের রাজনৈতিক মহলেও এর প্রভাব ও তাৎপর্য নিয়ে আলোচনা হয়। কারণ আদালত চত্বরের আইনজীবীরা সমাজের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে মতামত গঠন ও জনমত তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর বিজেপির অন্দরেও আত্মসমালোচনার সুর শোনা যাচ্ছে। দলের একাংশ মনে করছে, শুধুমাত্র ক্ষমতার প্রভাব বা সাংগঠনিক শক্তির উপর নির্ভর করলে চলবে না; আইনজীবীদের আস্থা অর্জনের জন্য তাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ও কার্যকর সাংগঠনিক উদ্যোগ প্রয়োজন। অন্যথায় ভবিষ্যতেও এমন ফলাফলের পুনরাবৃত্তি হতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ত্রিপুরা বার অ্যাসোসিয়েশন নির্বাচনের এই ফলাফলকে শুধুমাত্র একটি সংগঠনের নির্বাচন হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি আইনজীবী সমাজের একাংশের মনোভাব, প্রত্যাশা এবং অসন্তোষেরও প্রতিফলন। ফলে আগামী দিনে এই ফলাফল রাজ্যের বৃহত্তর রাজনৈতিক সমীকরণে কোনও প্রভাব ফেলে কিনা, সেদিকেই এখন নজর রাজনৈতিক মহল ও সাধারণ মানুষের।