আগরতলার প্রজ্ঞা ভবনে জনপ্রতিনিধিদের দায়িত্ব ও জবাবদিহিতা বিষয়ক কর্মশালায় রাজ্যপাল ইন্দ্র সেনা নাল্লু রেড্ডি, মুখ্যমন্ত্রী মানিক সাহা, রাজ্যসভার উপ-সভাপতি হরিবংশ নারায়ণ সিং এবং ডেপুটি স্পিকার রামপ্রসাদ পাল সহ অন্যান্য জনপ্রতিনিধিরা।
২৭শে ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার,২০২৬ আগরতলা- গণতন্ত্রের ভিত মজবুত করতে এবং জনআস্থাকে পুনর্নবীকরণ করতে আগরতলার প্রজ্ঞা ভবনে ২৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হলো এক ব্যতিক্রমী সেমিনার ও কর্মশালা। ত্রিপুরা বিধানসভা-র উদ্যোগে আয়োজিত “জনপ্রতিনিধিদের সকল শ্রেণি ও স্তরের মানুষের প্রতি দায়িত্ব ও জবাবদিহিতা” শীর্ষক এই কর্মসূচি রাজ্যের রাজনৈতিক পরিসরে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।অনুষ্ঠানটির বিশেষ তাৎপর্য ছিল এর সংযত ও সাদামাটা আয়োজন। প্রচার-ব্যানার বা বাহুল্যের পরিবর্তে মূল গুরুত্ব দেওয়া হয় বিষয়বস্তুর গভীরতা ও অংশগ্রহণমূলক আলোচনায়। কমনওয়েলথ পার্লামেন্টারি অ্যাসোসিয়েশন-এর নির্দেশিকা মেনে অনুষ্ঠিত এই কর্মশালায় শাসক ও বিরোধী—প্রায় সব রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের উপস্থিতি সাম্প্রতিক রাজনৈতিক আবহে বিরল বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।

উদ্বোধনী ভাষণে রাজ্যপাল ইন্দ্র সেনা নাল্লু রেড্ডি বলেন, “গণতন্ত্রের শক্তি জনগণের বিশ্বাসে নিহিত। সেই বিশ্বাস টিকিয়ে রাখতে হলে জনপ্রতিনিধিদের কাজের মধ্যে স্বচ্ছতা ও নৈতিকতার প্রতিফলন থাকতে হবে।”মুখ্যমন্ত্রী মানিক সাহা তাঁর বক্তব্যে জোর দিয়ে বলেন, “জনপ্রতিনিধি মানে শুধু প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়, মানবিক সংযোগও। মানুষের কথা শোনা, বিনয়ী আচরণ এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়া—এসবই জনআস্থার মূল চাবিকাঠি।” তিনি দলমত নির্বিশেষে “এক ত্রিপুরা, শ্রেষ্ঠ ত্রিপুরা” গড়ার আহ্বান জানান।রাজ্যসভার উপ-সভাপতি হরিবংশ নারায়ণ সিং সংবিধানসম্মত আচরণ ও সংসদীয় রীতি বজায় রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, এ ধরনের কর্মশালা যদি দেশের প্রতিটি রাজ্যে নিয়মিত আয়োজন করা হয়, তবে ভারতের সংসদীয় গণতন্ত্র আরও সুদৃঢ় হবে।ডেপুটি স্পিকার রামপ্রসাদ পালের সক্রিয় ভূমিকা ও তত্ত্বাবধানে আয়োজিত এই কর্মসূচিতে পার্লামেন্টারি বিষয়ক মন্ত্রী রতনলাল নাথ এবং মুখ্য সচেতক কল্যাণী রায় সহ একাধিক জনপ্রতিনিধি সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করেন। উপস্থিত অধিকাংশ বক্তাই মত দেন, বিধানসভা থেকে পঞ্চায়েত স্তর পর্যন্ত সকল নির্বাচিত প্রতিনিধিকে নিয়ে বছরে অন্তত একবার আত্মসমালোচনামূলক আলোচনা হওয়া প্রয়োজন।

অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন সাংসদ রাজীব ভট্টাচার্য, কৃতি সিং দেববর্মা, বিধায়ক দীপঙ্কর সেন প্রমুখ। সাংসদ বিপ্লব দেব ভার্চুয়ালি শুভেচ্ছা বার্তা দেন। বিরোধী দলনেতা জীতেন্দ্র চৌধুরী-র লিখিত বক্তব্য পাঠ করা হয়, যেখানে তিনি এ ধরনের উদ্যোগের প্রশংসা করেন এবং আরও বিস্তৃত পরিসরে আয়োজনের আহ্বান জানান।বনমালীপুরের বিধায়ক গোপাল চন্দ্র রায় বিধানসভার কার্যদিবস কমে যাওয়া ও বিরোধীদের মতপ্রকাশের সুযোগ সীমিত হওয়ার প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্যে গঠনমূলক সমালোচনাকে গণতন্ত্রের অপরিহার্য অংশ হিসেবে স্বীকার করার আহ্বান ছিল স্পষ্ট।রাজনৈতিক ভিন্নমত থাকা সত্ত্বেও কংগ্রেস, সিপিএম, বিজেপি, তিপ্রা মথা ও আইপিএফটি-র প্রতিনিধিদের একসঙ্গে মধ্যাহ্নভোজে অংশগ্রহণ অনুষ্ঠানের সৌহার্দ্যময় পরিবেশকে আরও উজ্জ্বল করে তোলে। অনেকের মতে, এটি ছিল রাজনৈতিক সহাবস্থানের এক ইতিবাচক বার্তা।

২০১৮-পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক টানাপোড়েনের প্রেক্ষাপটে এমন একটি যৌথ আলোচনা নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ। সামাজিক মাধ্যমেও কর্মশালাটি নিয়ে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ সমর্থন জানিয়েছেন, আবার কেউ কর্মসংস্থান, দুর্নীতি ও যুবসমাজের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন—যা গণতান্ত্রিক চর্চারই অংশ।সব মিলিয়ে, প্রজ্ঞা ভবনের এই কর্মশালা কেবল আনুষ্ঠানিক আয়োজন ছিল না; এটি ছিল আত্মসমালোচনার আয়না, দায়বদ্ধতার পুনরুচ্চারণ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে একটি নৈতিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার অঙ্গীকার। ত্রিপুরার রাজনৈতিক ইতিহাসে এটি এক উল্লেখযোগ্য মাইলফলক হিসেবেই স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
